এইকাল নিউজ:
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ভারতীয় সময় রাত সাড়ে আটটায় ওয়েবনিয়ারে অনুষ্ঠিত হল নদী-ভাবনা বিষয়ক একটি আলোচনাচক্র। ‘রিভার্স সেভিং নেটওয়ার্ক-ইউ.কে’-র উদ্যোগে এই সভায় ভারত, বাংলাদেশ, গ্রেট ব্রিটেন, কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সের বিভিন্ন শহর থেকে নদী বিশেষজ্ঞ, নদী গবেষক, নদী বাঁচাও আন্দোলনের কর্মী, নদীপ্রেমী মানুষেরা সম্মিলিত হয়ে নদী আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরলেন। গোটা আলোচনাসভাটি সুন্দরভাবে লন্ডন থেকে সঞ্চালনা করেছেন জনাব রফিকুল হাসান জিন্নাহ। তিনি আন্তরিকভাবে উপস্থিত সকলের কাছে করোনা অতিমারি আবহে এই আলোচনা সভার গুরুত্ব ও তাৎপর্য সংক্ষেসপে তুলে ধরেন। সভায় প্রায় ৫০ জন প্রতিনিধি অংশ গ্রহণ করেছেন।
বাংলাদেশের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জনাব অধ্যাপক অনু মহম্মদ নদীর সর্বনাশের মূলে দেশের উন্নয়ন নীতিকে দায়ি করেছেন। এই নীতির ফলে নদী দখল হয়ে যাওয়ার সমস্যার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতায় এসব কাজ চলছে। তিনি ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার কনভেনশন ও ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে নদী নিয়ে আলোচনায় স্বচ্ছতা আনা উচিত বলে অভিমত ব্যক্ত করেন।
ওয়াটার কিপারস অ্যালায়েন্স ও বাপা-র পক্ষে্ জনাব শরিফ জামিল যিনি কিনা একজন ‘নদী যোদ্ধা’ হিসেবে পরিচিত। এছাড়া বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনের একজন একনিষ্ঠ নেতা তিনি নদীর ঢাল, নদীর পাড় ও হাইড্রোমরফোলজিক্যাল সমীক্ষা র উপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, উপমহাদশীয় নদী রয়েছে সেখানে প্রতিবেশী পাঁচটি দেশের সঙ্গে আলোচনা না করেই ডেল্টা প্লান-২১০০ ঘোষণা করা হয়েছে। কিভাবে ডেল্টা বা সক্রিয় ব-দ্বীপ ব্যবস্থাপনা হবে সেই বিষয়গুলি বিষদ আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
লন্ডন রিভার কিপারস-এর থিও থমাস টেমস নদী-সহ শহরের ছোট ছোট নদীপথগুলির দূষণ নিয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। তিনি এই নিয়ে সচেতনা প্রসারের কাজ করে চলেছেন। নিকাশি কাজে এইসব নদী বর্জ্য বহন করছে বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
লন্ডনের জনাব আখতার রসুল খান বলেন, বাংলাদেশের নদীতে প্লাস্টিক বর্জ্য এক বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া পারদের মত ধাতুর দূষণ ঘটছে উপকূলীয় নদীগুলিতে। গোটা উপকূল এলাকায় ৩৮টি তাপ-বিদ্যুৎ(কয়লা) কেন্দ্র তৈরি হলে উপকূলের ও সুন্দরবনের পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাবে।
বাংলাদেশের সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস-এর জনাব ড. মমিমুল হক সরকার বলেন, প্লাবনভূমি দখল হয়ে যাচ্ছে। ব-দ্বীপ গঠনের কাজে আমরা বাধা দিচ্ছি। ভূ-ঢাল পরিবর্তনের ফলে কিছু নদী যেমন মজে গেছে তেমনি বহু নদীর জায়গা দখল হয়ে গিয়েছে বেআইনিভাবে।
জনাব ড. শহিদুল জামাল ভুঁইঞা বলেন, নদী বাঁচানোর দায়িত্ব সবার। জনগণকে সচেতন হতে হবে। আর সরকারকে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা বিজ্ঞানসম্মত রূপায়ণ করতে হবে। একাজে দুর্নীতি যেন অন্তরায় না হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা থেকে উৎপল দত্ত বলেন, তিনি চট্টগ্রামের কর্ণফুলি নদী পাড়ের মানুষ। নদী বাঁচাতে সহভাগী পরিকল্পনা প্রয়োজন। নদীকে বাঁচাতে নদী অববাহিকার মানুষকে যুক্ত করতে হবে। তিনি এও স্মরণ করিয়ে দেন বাংলাদেশের ৫৪টি নদী এসেছে ভারতের মধ্য থেকে, ৩টি এসেছে বার্মা থেকে। এইসব দেশের সঙ্গে যৌথভাবে এই নদীগুলি উন্নয়নে পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। তিনি এও বলেন, ‘নদী শাসন নয়-নদী ব্যবস্থাপনা’য় মানুষকে যুক্ত করতে হবে। জন আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারলে নদীরক্ষান হবে না।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে আলোচনায় অংশ নেন বিশিষ্ট নদী গবেষক ও নদী-পরিবেশ আন্দোলনের নিরলস কর্মী লেখক-সাংবাদিক সুকুমার মিত্র। তিনি বলেন, ভারত ও বাংলাদেশে দু’পারে নদীকে ঘিরে সমস্যায় প্রচুর মিল রয়েছে। বিশেষ করে সুন্দরবন ও উপকূলবর্তী এলাকায়। নদী চুরির ঘটনা এখানেও ঘটছে। নদীতে মারাত্মক দূষণ, ভূ-পৃষ্ঠের জলদূষণ ও ভূ-গর্ভস্থ জলের দূষণ(আর্সেনিক, ফ্লোরাইড, লবনতা ও নানা বর্জ্য-মল-দূষণ)-এর তথ্য তুলে বক্তব্য রাখেন। রিভার লিংকিং প্রকল্পের ও বড় বাঁধের সমস্যা সমালোচনা করে বলেন, বাংলাদেশের নদী নয়, পূর্ব ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের নদী মজে যাবে যদি রিভার লিংকিং প্রকল্প হয়। তবে তিনি ভারত-বাংলাদেশ উভয় দেশকে নদীকে ঘিরে ছোট-ছোট সমস্যাগুলি জিইয়ে না রেখে মিটিয়ে ফেললে উভয় দেশের মানুষের সৌহার্দ্য বজায় থাকবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। সুকুমারবাব আক্ষেষপের সঙ্গে বলেন, নদী-কেন্দ্রিক এপার বা ওপার বাংলায় নদীমন্ত্রক নেই। যা রয়েছে তা সেচদপ্তর, পানি উন্নয়ন পর্ষদ, পানি কমিশন ইত্যাদি। নদীর উপর গুরুত্ব যে কতটা কম তা আমাদের নদী মন্ত্রক না থাকার থেকেই প্রতিভাত হয়।
এদিন সভায় প্রায় ২১ জন বিশিষ্ট মানুষ আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন। জনাব ড. আহমেদ জামাল সভার শেষে শুভেচ্ছা বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে বলেন, পারস্পরিক মত বিনিময়ের মাধ্যমে নদী বাঁচাও, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন জোরদার হবে। রিভার্স সেভিংস নেটওয়ার্ক-ইউকে- এই কাজে সকলের সহযোগিতা প্রার্থনা করেছে।